যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকায় চীনের আলিবাবা


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকায় চীনের আলিবাবা

চীনের তিন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান আলিবাবা, বাইডু ও বিওয়াইডিকে চীনের সামরিক বাহিনীকে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে বেইজিং। এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতায়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন গতকাল সোমবার প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম অন্তর্ভুক্ত করে হালনাগাদ করা ‘চাইনিজ মিলিটারি কোম্পানিজ’ তালিকায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাস। দূতাবাসের এক মুখপাত্র একে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অযৌক্তিকভাবে সম্প্রসারিত করছে যুক্তরাষ্ট্র।

চীনা দূতাবাসের ভাষ্য, বিদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোরভাবে মেনে চলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিধি-বিধান। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই ভুল নীতি বন্ধ করে ন্যায়সঙ্গত ও বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য।

তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে চীনের বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলিবাবা। কোম্পানির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই তালিকায় আলিবাবার নাম অন্তর্ভুক্তির কোনো ভিত্তি নেই।

তিনি বলেছেন, ‘আলিবাবা কোনো সামরিক প্রতিষ্ঠান নয় এবং চীনের সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় কৌশলের অংশও নয়। কোম্পানিকে ভুলভাবে উপস্থাপনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বিওয়াইডি ও বাইডু।

পেন্টাগনের এই তালিকা হালনাগাদ করা হয় প্রতি বছর। ২০২৫ সালে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪। নতুন সংযোজনের ফলে এ সংখ্যা বেড়ে ১৮৮-এ পৌঁছেছে।

২০২১ সালে চালু হওয়া এই তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি মাসের শেষ দিক থেকে বিবেচিত হবে না যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতের চুক্তির জন্য।

পেন্টাগনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠান চীনা সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত, অথবা চীনের ‘মিলিটারি-সিভিল ফিউশন’ কৌশলে অবদান রাখে, তাদের চিহ্নিত করা হয় ‘চীনা সামরিক কোম্পানি’ হিসেবে। এই কৌশলের মাধ্যমে বেসামরিক ও সামরিক গবেষণা এবং উদ্ভাবনকে একীভূত করার চেষ্টা করে বেইজিং।

হালনাগাদ তালিকায় পেন্টাগন দাবি করেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ তদারকি ও প্রশাসন কমিশন এবং শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে আলিবাবা, বিওয়াইডি ও বাইডু সহায়তা করছে চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের চীনা কমিউনিস্ট পার্টি-বিষয়ক কৌশলগত প্রতিযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা জন মুলেনার বলেছেন, এই তালিকা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত চীনা কোম্পানিগুলোর বিষয়ে সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

এক বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দ্রুত প্রত্যাহার করা উচিত। পাশাপাশি যেসব সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আমাদের দেশ নির্ভরশীল, সেখান থেকেও তাদের পণ্য সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘আমেরিকান কোম্পানিগুলোর উচিত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বন্ধ করা। অন্যথায় তারা চীনের সামরিক উত্থানকে সহায়তা করছে।’


এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন গত মাসেই যু্তেরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিংয়ে দুই দিনের বৈঠকে অংশ নেন। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যযুদ্ধ ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার উত্তাপ কমানোর লক্ষ্যেই ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
আলিবাবা, বাইডু ও বিওয়াইডি যথাক্রমে ই-কমার্স, ইন্টারনেট অনুসন্ধান ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের সবচেয়ে পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম।

প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই, এমন জনপ্রিয় ভোক্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনা নতুন নয়। গত বছর উইচ্যাটের মালিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেনসেন্টকেও একই তালিকায় যুক্ত করেছিল পেন্টাগন।

নতুন তালিকায় আরও যুক্ত হয়েছে শেনঝেনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রোবোসেন্স টেকনোলজি এবং হ্যাংজুভিত্তিক ইউনিট্রি রোবোটিকস।

তবে এই ধরনের বিস্তৃত কালো তালিকার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ডেনিস ওয়াইল্ডার। সিআইএ ও হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে চীনবিষয়ক দায়িত্ব পালন করা এই বিশেষজ্ঞের মতে, অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর।

কেবল নাম অন্তর্ভুক্ত করলেই তারা সেই সম্পর্ক ত্যাগ করবে না, যদি না কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়াইল্ডার বলেছেন, ‘এত বিস্তৃত পরিসরের নিষেধাজ্ঞা সাধারণত কার্যকর হয় না। যুক্তরাষ্ট্র যদি পুরোপুরি চীনা অর্থনীতি থেকে নিজেদের আলাদা করতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে এ ধরনের পদক্ষেপ মূলত প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেই থেকে যাবে।’

আলজাজিরা
 

Link copied!