নারী-পুরুষের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দিকে জোর দেওয়া হলেও তা যেন অধরা থেকে যাচ্ছে। দিন শেষে নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর সেই বৈষম্যের চিত্রই ফুটে উঠছে। সমাজব্যবস্থায় নারীকে পুরুষ, বিপরীত পক্ষের মনে করে থাকে। নারীর প্রতি এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি ছয় বছর ধরে প্রচার করছে ‘অন্যপক্ষ’ অনুষ্ঠানটি। শুক্র ও শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠানটি প্রচার হয়। এটির সঞ্চালনা দায়িত্ব সামলাচ্ছেন চ্যানেলটির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইশরাত জাহান ঊর্মি। মূলত নারীর অধিকার, সংগ্রাম আর নিরন্তর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিক নিয়ে এই অনুষ্ঠানে কথা বলা হয়। সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে আলাপকালে অনুষ্ঠানটির লক্ষ্য, বাস্তবতা আর সফলতার আদ্যোপান্ত নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
সংবাদ প্রকাশ: অনুষ্ঠানটির নাম ‘অন্যপক্ষ’ কেন?
ইশরাত জাহান ঊর্মি: আমাদের সমাজে নারীকে ভিন্ন চোখে দেখা হয়। তাদের আলাদা একটি জাতি মনে করে সব সময়। নিজেদের মনে করে না। তাই প্রতিবাদের জায়গা থেকে ‘অন্যপক্ষ’ নামটি ব্যবহার করেছি।
সংবাদ প্রকাশ: কেবল নারীদের নিয়ে এই অনুষ্ঠান শুরুর পেছনের কারণটা জানতে চাই।
ইশরাত জাহান ঊর্মি: অন্যপক্ষ অনুষ্ঠানটি ইস্যুভিত্তিক। নারীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এখানে কথা বলা হয়। নারীবাদ নিয়ে যে ভুল ধারণা আছে, সেগুলোও ভেঙে দেওয়ার জন্য আমরা এই অনুষ্ঠান শুরু করি। আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোতে নারীকেন্দ্রিক ইস্যুগুলোকে অবহেলার চোখে দেখা হয়। আমরা চাই নারীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজের মানুষকে সচেতন করতে। এই অনুষ্ঠানটি করার পেছনে এটাও একটি কারণ। আসলে নারীকে বাদ রেখে কোনো কিছুই সম্ভব নয়। জাতীয় যেকোনো কিছুরই অংশ নারী।
সংবাদ প্রকাশ: এ ধরনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই।
ইশরাত জাহান ঊর্মি: অনেকে আমাকে বলেন যে আমার এই অনুষ্ঠান মধ্যবিত্ত কিংবা শহুরে নারীকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। তৃণমূলের নারীদের সংগ্রামের কথা বলছি না। আসলে, সবকিছু নিয়ে এক অনুষ্ঠানে কাজ করা সম্ভব নয়। এই যে শহুরে নারীদের কথা যদি বলি, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে কাজের চাপ—সবকিছু তাকে সামলাতে হচ্ছে। নারী অফিসেও কাজ করছে। ঘরে গিয়ে কাজ করছে। এর মাধ্যমে নারীর ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনি দেখবেন, অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের স্লোগান আছে, ‘আমি নারী আমি সব পারি’। এর মাধ্যমে কী বোঝায়, আমি নারী হলে আমাকে সব পারতে হবে? অফিস সামলাতে হবে। আবার ঘরে এসে ভাত রান্না করতে হবে। এগুলো আসলে ঠিক না। এটা অন্যায় আচরণ। আমার অভিজ্ঞতা বলে, শহুরে কর্মজীবী নারীদের সমস্যাগুলো শেষ হয়ে যায়নি। তাদের সমস্যার কথাগুলো যদি তুলে ধরতে পারি, তাহলে সেটাও কম না। প্রচুর মানুষ অনুষ্ঠানটি গ্রহণ করেছে। এমন না যে, সব ধরনের দর্শক অনুষ্ঠানটি দেখেন। এই অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু দর্শক তৈরি হয়েছে। তারা এটি দেখার জন্য অপেক্ষা করে।
সংবাদ প্রকাশ: আপনার এই অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের নারীমুক্তির কোন জায়গায় অবস্থান করছে?
ইশরাত জাহান ঊর্মি: আমরা একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছি। একদিকে নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে, অন্যদিকে নারীবিদ্বেষ বাড়ছে ভয়ংকরভাবে। তবে আজকাল অনলাইনে নারীরা কথা বলছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। এটাও এক যুগ আগেও তো কল্পনা করা যেত না। এটা ভালো দিক। আবার অনলাইনে যেভাবে নারীদের হয়রানি করা হয়, সেটা অ্যালার্মিং। মেয়েদের কটাক্ষ করার ভেতর পুরুষত্ব খুঁজে পাচ্ছে কেউ কেউ। এসব দিক বিবেচনায় বলা যায় নারীমুক্তির মধ্যবর্তী জায়গায় আমরা অবস্থান করছি। এই পরিস্থিতি থেকে নারীমুক্তি কোন দিকে বাঁক নেবে, সেটা বলা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, নারীর প্রতি এই বৈষম্য একদিন দূর হবে।
সংবাদ প্রকাশ: আপনারা যে উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানটি শুরু করেছেন, সেটি কি সফল হচ্ছে বলে মনে করেন?
ইশরাত জাহান ঊর্মি: এই অনুষ্ঠানে নারীদের এমন কোনো বিষয় নেই যে আমরা আলোচনা করিনি। তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি আমি সফল। আজ না হোক, আজ থেকে ১০ বছর পরে হলেও সমাজে এর প্রভাব পড়বে। ১০ বছর আগে আমরা যৌনতা, নারীর পিরিয়ড নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পেতাম। গণমাধ্যমে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা ট্যাবু ছিল। সেই ট্যাবু ভেঙে গেছে। এখন মেয়েরা তাদের পিরিয়ডের সমস্যার কথা বলছে। ১০ বছর আগে এসব বিষয় নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়েছিল। যার ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ঠিক একইভাবে ‘অন্যপক্ষ’ অনুষ্ঠানে যে কথাগুলো বলা হচ্ছে, তার ফলও ১০ বছর পর পাওয়া যাবে।


































