মায়ের গুরুতর অসুস্থতার সময়েও দেশে ফেরার বিষয়ে ‘একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত নয়’—তারেক রহমানের এমন মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বক্তব্যে প্রশ্ন উঠছে—তিনি কেন দেশে ফিরতে পারছেন না এবং এই সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে। খবর বিবিসির।
শনিবার সকালে বিএনপির নামে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়, খালেদা জিয়ার সংকটময় অবস্থায় ছেলের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হলেও এ বিষয়ে তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ “সম্পূর্ণ এককভাবে সম্ভব নয়” এবং বিষয়টি “স্পর্শকাতর হওয়ায় বিস্তারিত ব্যাখ্যার সুযোগ নেই।” কিছুক্ষণের মধ্যেই তারেক রহমান তার ব্যক্তিগত ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একই বার্তা পোস্ট করেন।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এ বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “তারেক রহমানের ফেসবুক স্ট্যাটাসেই সব ব্যাখ্যা রয়েছে।” এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে লিখেছেন—তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে সরকারের কোনো নিষেধাজ্ঞা বা আপত্তি নেই।
এর আগে একাধিক সময়ে বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, তারেক রহমান নভেম্বরেই দেশে ফিরবেন। অক্টোবরের শুরুতে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি “দ্রুত দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার” ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু নভেম্বরের শেষ প্রান্তে এসে নিজেই জানান—দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তার হাতে নেই।
খালেদা জিয়ার হঠাৎ অবনতি এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সামাজিকমাধ্যমে তারেক রহমানকে ফিরে আসার আহ্বানও বাড়তে থাকে। শুক্রবার বিএনপি মহাসচিব জানান, চিকিৎসকেরা খালেদা জিয়ার অবস্থা “সংকটময়” বলেছেন। এরপরই ফেরার জল্পনা আরও তীব্র হয়।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৫ মাস অতিক্রান্ত। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে হওয়া সব মামলায় তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান আদালতের প্রক্রিয়ায় অব্যাহতি পেয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকেও নিরাপত্তাজনিত কারণে বুলেটপ্রুফ গাড়ি ও অস্ত্র লাইসেন্সের আবেদন করা হয়েছে—যা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ফলে মামলা বা নিরাপত্তা—কোনো দিক থেকেই দৃশ্যমান বাধা নেই।
তবু বিএনপির কিছু সূত্র বলছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে “প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের আপত্তি” থাকতে পারে, যদিও কোন দেশ এবং কীভাবে আপত্তি জানিয়েছে তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, তারেক রহমানের বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়—দেশে ফেরা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এর পেছনে আরও কিছু নিয়ামক রয়েছে। তিনি বলেন, উইকিলিকস ফাঁস হওয়া নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়টি উঠে এসেছিল, আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১/১১–র সময় তারেক রহমানের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা মুচলেকা থাকার কথা বলা হয়ে থাকে। এমনকি তিনি বর্তমানে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েছেন কি না—সেটিও পরিষ্কার নয়।
মহিউদ্দিন আহমদ মনে করিয়ে দেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার কথিত ‘মাইনাস টু’ আসলে বড় দুই পরিবারকেই রাজনীতি থেকে সরানোর বৃহত্তর ‘মাইনাস ফোর’ পরিকল্পনার অংশ ছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোয় “একটি মাইনাস বাস্তবায়িত” হয়েছে; খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ—ফলে অনিশ্চয়তা এখন তারেক রহমানকে ঘিরে। তার দেশে ফেরা বিলম্ব হলে “পরিস্থিতি মাইনাস ফোরে রূপ নেবে কি না”—সেটি সময়ই বলে দেবে।
তবে বিএনপির কয়েকজন নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন—নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে পরিস্থিতি যাই হোক, তারেক রহমান দেশে ফিরবেন এবং নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেবেন।