হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট। দানিউব নদীর তীর ঘেঁষে হাঁটলে, দেশটির সুবিশাল পার্লামেন্ট ভবনের কাছাকাছি এক জায়গায় চোখে পড়ে অদ্ভুত একটি দৃশ্য—ষাট জোড়া পুরনো জুতা পড়ে আছে নদীর ধার বরাবর। জুতাগুলো দেখতে ঠিক ১৯৪০–এর দশকের মতো, যে সময় মানুষ এমন নকশার জুতা পরত। সেখানে পুরুষের ভারী বুট আছে, নারীদের নান্দনিক জুতা আছে, এমনকি ছোট ছোট শিশুর জুতাও আছে—যেন একটি পরিবারের সবার উপস্থিতি একসঙ্গে জমে আছে ওই পাড়ে।
প্রথম দেখায় মনে হয়, কেউ যেন তাড়াহুড়ো করে জুতা খুলে রেখে চলে গেছে। জুতাগুলো নদীর ধারে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে—কিছু পাশাপাশি, কিছুটা দূরে দূরে, কোথাও আবার উল্টে থাকা—আর সেই এলোমেলো ভঙ্গিই ভয় ধরায়। কারণ এতে মনে হয়, মালিকরা পরিকল্পনা করে নয়, আকস্মিক আতঙ্কে থেমে গিয়েছিল; তারপর আর ফেরেনি।
কিন্তু কাছে গিয়ে বোঝা যায়, এগুলো সাধারণ জুতা নয়। চামড়া বা কাপড়ের জুতা নয়—এগুলো লোহার তৈরি, মরিচা ধরা, আর নদীর পাড়ের কংক্রিটের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসানো। সময়ের ধুলো, বৃষ্টির জল, শীতের কুয়াশা—সবকিছুর দাগ লেগে আছে ধাতব শরীরে। এই জুতাগুলো আসলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ: ১৯৪৪–৪৫ সালের শীতকালে দানিউব নদীর তীরে নিহত হাঙ্গেরীয় ইহুদিদের স্মরণে নির্মিত নীরব এক প্রতিবাদ।
এই স্মৃতিস্তম্ভের নাম ‘দ্য শুজ অন দ্য দানিউব প্রমেনেড’। এর ধারণা দেন চলচ্চিত্র পরিচালক কান তোগাই। ভাস্কর জিউলা পাউয়েরের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি এটি নির্মাণ করেন—এমনভাবে, যেন স্মৃতির ভার কোনো উঁচু মিনার হয়ে দাঁড়ায় না, বরং মাটির কাছেই পড়ে থাকে, মানুষের চোখের সামনে, মানুষের হাঁটার পথেই।
স্মৃতিস্তম্ভটির তিনটি স্থানে ঢালাই লোহার ফলকে লেখা রয়েছে হাঙ্গেরিয়ান, ইংরেজি ও হিব্রু ভাষায়। সেখানে বলা হয়েছে: ‘১৯৪৪–৪৫ সালে অ্যারো ক্রস মিলিশিয়াদের হাতে দানিউবে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহতদের স্মরণে।’ কয়েকটি বাক্যে বলা সেই কথা, কিন্তু এর পেছনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং অন্ধকারে মোড়া।
১৯৪৪ সালের শরৎ ও ১৯৪৫ সালের শীতে বুদাপেস্টে নেমে আসে যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা। জার্মান বাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে তৎকালীন সরকারকে। ক্ষমতায় আসে ফেরেঙ্ক সালাশি ও তার চরম ইহুদিবিদ্বেষী অ্যারো ক্রস পার্টি। এরপর শহরজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ দমন-পীড়ন—যেখানে মানুষ পরিচয়ের কারণে নিরাপদ থাকা তো দূরের কথা, বেঁচে থাকার অধিকারও হারাতে থাকে।
অ্যারো ক্রস মিলিশিয়ারা রাস্তায় রাস্তায় ইহুদিদের ধরে মারধর, লুটপাট, অপমান এবং প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকে। শহরের নানা জায়গায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। দানিউব নদীতে গুলি করে হত্যা করা ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে “সহজ” উপায়—কারণ নদীর স্রোত লাশ ভাসিয়ে নিয়ে যেত, প্রমাণ মুছে দিত, এবং ভয়কে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিত।
অনেক ক্ষেত্রে, গুলি করার আগে আতঙ্কিত মানুষদের জোর করে জুতা খুলতে বাধ্য করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জুতা ছিল দামী ও মূল্যবান সম্পদ—চোরাই বাজারে বিক্রি করা যেত, সৈন্যদের কাজে লাগানো যেত, বা লুটের অংশ হিসেবে রাখা যেত। তাই মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে জুতা খুলে নেওয়ার নির্দেশ ছিল একদিকে লোভের হিসাব, অন্যদিকে অপমানের চূড়ান্ত রূপ—মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, সম্পদের উৎস হিসেবে দেখার নির্মম প্রমাণ।
এই কারণেই দানিউবের তীরে পড়ে থাকা লোহার জুতাগুলো শুধু শিল্পকর্ম বা স্মৃতিচিহ্ন নয়। এগুলো সেই নৃশংসতার নীরব সাক্ষী—যেখানে প্রতিটি জুতার ভেতরে অনুপস্থিত এক জোড়া পায়ের গল্প আছে, একটি পরিবারের গল্প আছে, আর একটি শহরের ক্ষতচিহ্ন আছে। নদীর জল যেমন প্রতিদিন বয়ে চলে, তেমনি এই জুতাগুলোও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—কথা না বলেও যেন মনে করিয়ে দেয়: কিছু ইতিহাস ভুলে গেলে, তা আবার ফিরে আসে।